লোড হচ্ছে...
ই-পেপার (E-Paper)

জেল খেটেছেন, লিখে বিখ্যাতও হয়েছেন! জেফ্রি আর্চারের জীবন ঘনঘটায় ভরা

জেফ্রি হাওয়ার্ড আর্চার। প্রকৃতপ্রস্তাবে রাজনীতিবিদ। ১৯৬৯-‘৭৪ পর্যন্ত লিঙ্কনশায়ারের একটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। পরে নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন...
জেল খেটেছেন, লিখে বিখ্যাতও হয়েছেন! জেফ্রি আর্চারের জীবন ঘনঘটায় ভরা
জেল খেটেছেন, লিখে বিখ্যাতও হয়েছেন! জেফ্রি আর্চারের জীবন ঘনঘটায় ভরা ছবি সৌজন্য: ওটু নিউজ বাংলা ডেস্ক

জেফ্রি হাওয়ার্ড আর্চার। প্রকৃতপ্রস্তাবে রাজনীতিবিদ। ১৯৬৯-‘৭৪ পর্যন্ত লিঙ্কনশায়ারের একটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। পরে নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। হয়ে ওঠেন লেখক। ব্যক্তিগত জীবন ঘনঘটায় ভরা।

লন্ডনের ট্যাবলয়েডের সঙ্গে মামলায় জড়িয়েছেন। জিতে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। পরে আবার দোষী সাব্যস্ত হন। লিখলেন প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত। লন্ডন শহরের একটি নামজাদা রেস্তরাঁর মালিক মাইকেল হুইটেকার। ওয়েস্টএন্ডে নাটক দেখতে গিয়ে প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়েছিল অ্যানা টাউনসেন্ডের।

বক্স অফিসে অনেক চেষ্টা-চরিত্র আর গাঁটের কড়ি খসিয়ে অ্যানার পাশের আসনখানা বাগিয়ে ফেলেছিল সে। তারপর আলাপ জমাতে আর বেশি সময় লাগেনি। এক জমজমাট প্রেমের গল্প হতেই পারত ‘ওয়ান ম্যান’স মিট’। এমন প্রারম্ভের পর বিয়োগান্তক হতেও বাধা ছিল না; আবার ভেবেচিন্তে ক্রাইম কাহিনিতেও পরিণত করা যেত।

কিন্তু এর কোনওটিই হল না। হবে কী করে? লেখকের নাম যে জেফ্রি আর্চার! গল্পটি তিনি শেষ করলেন ৪টি ভাগে বিভক্ত আলাদা ক্লাইম্যাক্সে। হুইটেকারের রেস্তোরঁার মেনুর বিখ্যাত ‘স্টেক’ আর গল্পের শিরোনামের ‘মিট’-এর খাতিরে সেই গল্পের চারটি আলাদা শেষের অধ্যায়ের নাম রাখা হয়েছিল– ‘রেয়ার’, ‘বার্ন্ট’, ‘ওভারডান’ এবং ‘আ পঁয়া’।

ছোটগল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, তার শেষের অভাবনীয় পরিণতি– যাকে বলে ‘টুইস্ট ইন দ্য টেল’ বা বাংলায় ‘ল্যাজের মোচড়’। এই জিনিসটির জন্য বিশ্বখ্যাত ও’হেনরি। রোয়াল্ড ডাল-ও কম যাননি এমন গল্প লেখায়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় ‘বনফুল’ বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের নামও।

এঁদেরই যোগ্য উত্তরসূরি হলেন জেফ্রি হাওয়ার্ড আর্চার, ‘ব্যারন আর্চার অফ ওয়েস্টন-সুপার-মেয়ার’, যিনি লেখক রূপে আজীবন ‘জেফ্রি আর্চার’ নামটিই ব্যবহার করেছেন। জেফ্রি আর্চার দেউলিয়া হওয়া থেকে বেঁচেছিলেন ভাগ্য নয়, নিজের কলমের জোরে।

কঠিন সেই পরিস্থিতিতে লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নট আ পেনি মোর, নট আ পেনি লেস’-এর (১৯৭৬) বিপুল বিক্রি আর্চারকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। জেফ্রি আর্চার (১৯৪০) ছিলেন রাজনীতিবিদ। ১৯৬৯ থেকে ’৭৪ পর্যন্ত তিনি লিঙ্কনশায়ারের একটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টের সদস্য (কনজারভেটিভ পার্টির হয়ে) ছিলেন।

কিন্তু পরের নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। শোনা যায়, সেই সময় তাঁর নাকি দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সংসদের অভিজ্ঞতা এবং ব্রিটিশ রাজনীতির উপর ভিত্তি করে আর্চার লিখেছিলেন ‘ফার্স্ট অ্যামং ইকুয়াল্‌স’ (১৯৮৪) উপন্যাসটি।

সেই কাহিনির চারটি প্রধান চরিত্র– সাইমন কার্সলেক, রেমন্ড গুল্ড, অ্যান্ড্রু ফ্রেজার ও চার্লস স্যেমুর। এর মধ্যে শেষোক্ত চরিত্রটির সঙ্গে আর্চারের দেউলিয়া হওয়ার উপক্রমের খুব সামান্য সাদৃশ্য পাওয়া যায়। গল্পের স্যেমুর ভাগ্যজোরে সে-যাত্রা বেঁচে গিয়েছিলেন; কিন্তু বাস্তব জীবনে জেফ্রি আর্চার দেউলিয়া হওয়া থেকে বেঁচেছিলেন ভাগ্য নয়, নিজের কলমের জোরে।

কঠিন সেই পরিস্থিতিতে লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নট আ পেনি মোর, নট আ পেনি লেস’-এর (১৯৭৬) বিপুল বিক্রি আর্চারকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য শুধু চার্লস স্যেমুরের সঙ্গে মিলই নয়; জেফ্রি আর্চার সারাজীবন যেমন থ্রিলার, সাসপেন্স ও নানাবিধ চড়াই-উতরাইয়ের কাহিনি লিখেছেন, তাঁর নিজের জীবন জুড়েও ঘটেছে ঠিক তেমনই নানা রোমাঞ্চকর ঘটনা।

১৯৭৭ সালে তিনি লেখেন ‘শ্যাল উই টেল দ্য প্রেসিডেন্ট? ’ উপন্যাসটি। সে কাহিনির পটভূমি আমেরিকা এবং বেশ কয়েকটি চরিত্র বাস্তব– যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড কেনেডি। এফবিআইয়ের সাধারণ এজেন্ট মার্ক অ্যান্ড্রুজ কীভাবে প্রায় একা হাতে প্রেসিডেন্টকে হত্যার চক্রান্ত বানচাল করে দোষীদের খুঁজে বের করে, তা নিয়েই এই উপন্যাস।

জেফ্রি আর্চার (১৯৪০) ছিলেন রাজনীতিবিদ। ১৯৬৯ থেকে ’৭৪ পর্যন্ত তিনি লিঙ্কনশায়ারের একটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টের সদস্য (কনজারভেটিভ পার্টির হয়ে) ছিলেন। কিন্তু পরের নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। বইটির প্রকাশকালে ‘ভাইকিং প্রেস’-এ উঁচু পদে কাজ করতেন কেনেডির ভ্রাতৃবধূ জ্যাকলিন কেনেডি।

বাস্তব জীবনের এডওয়ার্ড কেনেডি ছিলেন বিখ্যাত সেনেটর ও রাজনীতিবিদ, তবে তিনি কখনও প্রেসিডেন্ট হননি; হয়েছিলেন তাঁর দাদা জন এফ কেনেডি। তা সত্ত্বেও কেনেডি পরিবারের এক সদস্যকে খুনের চক্রান্ত সংবলিত বইয়ের প্রকাশ আটকাতে না পারায় কেনেডি পরিবার জ্যাকলিনের সমালোচনা করেছিল।

পরে জেফ্রি আর্চার নিজে ওই বইটির নতুন সংস্করণে এডওয়ার্ড কেনেডির বদলে তঁার আগের বিখ্যাত উপন্যাস ‘কেন অ্যান্ড এবেল’ ও ‘দ্য প্রডিগাল ডটার’-এর চরিত্র ফ্লোরেন্টিনা কেন-কে প্রেসিডেন্টের আসনে বসিয়ে কেনেডি পরিবারের সঙ্গে উপন্যাসটির বিতর্ক চুকিয়ে দেন।

১৯৮৬ সালের অক্টোবরে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড পত্রিকা ‘নিউজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ খবর প্রকাশিত হয় যে, মনিকা কঘলান নামের এক যৌনকর্মীকে ২ হাজার পাউন্ড দিয়েছেন জেফ্রি আর্চার। আর্চার দাবি করেন, মহিলাটির দুর্দশা দেখে তিনি এই টাকা সাহায্য করেছিলেন।

কিন্তু কয়েক দিন পরেই ‘ডেইলি স্টার’ ট্যাবলয়েডে লেখা হয়, আর্চার আসলে যৌন সংসর্গের মূল্য বাবদ এই টাকা মনিকাকে দিয়েছেন। ১৯৮৭ সালে ‘ডেইলি স্টার’-এর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন আর্চার। মনিকা সেই মামলার সাক্ষ্যে বলেন, একটি সস্তার হোটেল ঘরে আর্চার তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের জন্য ৭০ পাউন্ড দিয়েছিলেন– ‘কাজের’ আগে ৫০ এবং পরে ২০ পাউন্ড।

কিন্তু আর্চার সাক্ষ্য-প্রমাণ-সহ তুলে ধরেন যে, ওই দিন ওই নির্দিষ্ট সময়ে তিনি অন্যত্র উপস্থিত ছিলেন। মামলায় জিতে যান জেফ্রি আর্চার। ক্ষতিপূরণ বাবদ পান ৫ লাখ পাউন্ড। এর কয়েক দিনের মধ্যে শহর ছেড়ে চলে যেতে হয় মনিকা কঘলানকে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চাকরি যায় ‘দ্য ডেলি স্টার’-এর সম্পাদক লয়েড টার্নারের।

তবে জেফ্রি আর্চারের বিপদ এখানেই শেষ হয়নি। ২০০১ সালের মে মাসে মোটরগাড়ির ধাক্কায় নিহত হন মনিকা কঘলান। এর মাসখানেকের মধ্যে আর্চারের পক্ষের প্রধান সাক্ষী টেড ফ্রান্সিস স্বীকার করেন, তিনি ১৩-১৪ বছর আগে জেফ্রি আর্চারের নির্দেশেই মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

আর্চারের প্রাক্তন আপ্তসহায়ক অ্যাঞ্জেলা পেপিয়েটও তাঁর পুরনো ডায়েরির ভিত্তিতে জানান, সেই বিশেষ দিনে আর্চার যেখানেই গিয়ে থাকুন না কেন, টেড ফ্রান্সিসের সঙ্গে দেখা করেননি। ফলে ২০০১ সালের জুলাইয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ানোর দায়ে আর্চারের ৪ বছরের কারাদণ্ড হয়।

‘ডেইলি স্টার’ ক্ষতিপূরণের টাকা সুদসমেত ফেরত পায়। কারারুদ্ধ হয়ে আর্চারের রাজনৈতিক জীবন প্রায় শেষ হয়ে গেলেও তাঁর কলমকে থামানো যায়নি। জেলখানার দিনলিপি নিয়ে তিন খণ্ডে লেখেন ‘প্রিজন ডায়েরিজ’। অবশ্য ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘সন্‌স অফ ফরচুন’ উপন্যাসের প্লটে তাঁর বন্দিদশার জীবনের ছাপ ও কিছু অবাস্তবতা দেখা যায়।

২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘ফল্‌স ইমপ্রেশন’-এও কিছু অসংগতি লক্ষ করা গিয়েছিল, যা বাস্তবে ঘটা বেশ কষ্টকল্পিত। যেমন: ৯/১১-র ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে কাহিনির চরিত্রদের ভিসা ছাড়াই যখন-তখন এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়া বা বিমানবন্দরের ঢিলেঢালা নিরাপত্তার বিষয়গুলি।

অবশ্য এই ধরনের দু’-একটি ভুলচুক বা মিথ্যা সাক্ষ্যের দায়ে জেল-খাটা লেখক হিসাবে আর্চারের জনপ্রিয়তাকে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ করতে পারেনি। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৭টি উপন্যাসের সিরিজ ‘দ্য ক্লিফটন ক্রনিকল্‌স’-এ তিনি লিখেছেন জাহাজঘাটার রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ছোকরা হ্যারি ক্লিফটনের মাল্টি-মিলিয়নেয়র হয়ে ওঠার কাহিনি।

যেখানে গল্পের সমান্তরালে ১৯২০ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের চলমান সামাজিক ইতিহাসও ফুটে উঠেছে। আবার সাধারণ বিটের কনস্টেবল থেকে উইলিয়াম ওয়ারউইকের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বড়কর্তা হয়ে ওঠার কাহিনি লিখেছেন ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৮টি উপন্যাসে।

এরই মাঝে, একটি সামান্য সিদ্ধান্তে কীভাবে মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে– তার চমকপ্রদ বিবরণ অনন্য আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলেছেন ‘হেডস ইউ উইন’ উপন্যাসে। রাজনীতির সাফল্য-ব্যর্থতা, বিতর্ক কিংবা কলঙ্ক– সবকিছুকে নেপথ্যে রেখে জেফ্রি আর্চারকে অমর ও চিরস্মরণীয় করে রেখেছে তাঁর সৃষ্টি করা কালজয়ী সাহিত্য ও চরিত্ররা।

(মতামত নিজস্ব)।

রাজ্য ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে প্রশাসনিক ও স্থানীয় স্তরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। ঘটনার সত্যতা ও নিরপেক্ষ তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ওটু নিউজ বাংলার মূল লক্ষ্য।

প্রতি মুহূর্তের তাজা বাংলা খবর এবং ব্রেকিং খবরের আপডেটের জন্য চোখ রাখুন ওটু নিউজ বাংলায়।

HABIB TANVEER
HABIB TANVEER
Reporter

ওটু নিউজ বাংলার নিয়মিত প্রতিবেদক। সত্য ও নির্ভীক সাংবাদিকতায় দায়বদ্ধ।

সম্পর্কিত খবর

O2 News Bangla
Icon
O2 News App
খবর পড়ুন আরও দ্রুত