এ বছর ফিজিওলজি ও মেডিসিনে নোবেল পেয়েছেন পিটার হেগেম্যান-সহ কার্ল ডিসেরথ এবং জর্জ নাগেল। ক্ল্যামাইডোমোনাস শৈবাল গবেষণার মধ্যমণি। মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আলোর দিকে শৈবালগুলি ছুটে ছুটে যায়। হেগেম্যান মোক্ষম প্রশ্নটা ছোড়েন, ‘কেন যায়?
’ সুমন প্রতিহার: একটি ফোন এসেছে, অচেনা নম্বর, পিটার হেগেম্যান ধরলেন। ওপার থেকে বলা হল, আপনার জন্য দারুণ খবর আছে, ফোন করুন। ফোন গেল কেটে। এটা কি মশকরা? বেশ সমস্যা, এবার কর্তব্য কী? হেজেম্যান ভাবছেন। হঠাৎ স্মৃতিতে নড়ে উঠল, নম্বরের শুরুর ক’টা সংখ্যা, ‘জিরো জিরো থ্রি সিক্স’।
এই নম্বর তো সুইডেনের! অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে হাম্বল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরের কাছে ফোন এসেছে সুইডেন থেকে। পৃথিবীসুদ্ধ লোকে জানে, এ মাস নোবেলের। উৎকণ্ঠা চেপে ফোন করতেই– নোবেল কমিটির প্রেসিডেন্ট বললেন– একটু পরেই ঘোষণা হতে চলেছে, আপনি ও আপনার আরও দুই সহ-গবেষক (কার্ল ডিসেরথ, জর্জ নাগেল) এ বছর ফিজিওলজি ও মেডিসিনে নোবেল পাচ্ছেন।
নোবেল কমিটির একটি নিজস্ব ওয়েবসাইটও রয়েছে, নোবেল প্রাপকদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হয় সেখানে। সাক্ষাৎকারে হেগেম্যান বললেন, এই গবেষণার শুরু ১৮৬৬ সালে এক রুশ বিজ্ঞানীর ভাবনায়। সেন্ট পিটার্সবুর্গের পুকুরের জল নিয়ে তঁার গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল ফ্রান্সের এক জার্নালে।
অবাক হতে বাকি এখনও। হেগেম্যান বললেন, রাশিয়ান বিজ্ঞানী এককোষী শৈবাল ক্ল্যামাইডোমোনাস (Chlamydomonas) নিয়ে ইলেকট্রিসিটি ছাড়াই গবেষণা এগিয়েছিলেন। এমন যঁার অধ্যবসায়, গবেষণার প্রসাদ তো তাঁরই। জার্নাল ‘সায়েন্স’-এও ক্ল্যামাইডোমোনাসের আলো-সংবেদী আয়ন পথ সংক্রান্ত গবেষণা প্রকাশ পায়।
একজন পরীক্ষক মজা করে বলেন, ‘পুকুরের ময়লা থেকে নতুন আয়ন পথের খোঁজ’। ক্ল্যামাইডোমোনাস শৈবাল তখন পুকুরের ময়লা। মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আলোর দিকে শৈবালগুলি ছুটে ছুটে যায়, হেগেম্যান মোক্ষম প্রশ্নটা ছুড়লেন, ‘কেন যায়?
’ গবেষণার গভীরে পৌঁছতে জানা গেল ক্ল্যামাইডোমোনাসের পুচকে দেহে এক বিশেষ প্রোটিনের উপস্থিতির কথা। সেই প্রোটিন আলো ঠাহর করতে পারে শুধু নয়, আলো দেখলেই পোঁ-পোঁ দৌড়ও লাগায়। হেগেম্যানের গবেষণায় যুক্ত হলেন জর্জ নাগেল, জার্মানির উজবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএমইউ) অধ্যাপক।
নোবেল পেয়েছেন তিনিও। অবসরের পরে, জার্মানির শীতে, কাতর হয়ে প্রতি বছর স্ত্রী-কে নিয়ে ইতালিতে যান। থাকার জম্পেশ একটি বন্দোবস্ত রয়েছে সেখানে। নাপোলিতে জর্জের শ্বশুরবাড়ি। প্রতি শীতে সেখানে যান, বেঁটে পাহাড়ের মাথায় চাপেন, হেলায় কাটে শীতের সব বেলা।
নোবেলের ফোনটিও পেয়েছেন শ্বশুরবাড়িতে বসেই। সাক্ষাৎকার অবশ্যি দিলেন পরদিন সকালে, শ্বশুরবাড়ির ছাদে দঁাড়িয়ে, মাথায় চকচকে রোদ, বাতাসে তখন লেবুপাতার গন্ধ। জর্জের একটা ছোট্ট ভুল গবেষণার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। গবেষণার শুরুতে একদিন দ্রবণের পিএইচ কমিয়ে ফেলেন, তাতেই ম্যাজিক।
ক্ল্যামাইডোমোনাসের চ্যানেলরোডোপসিন (Channelrhodopsin)-এর প্রোটিনগুলি নীল আলোয় ব্যাঙের ডিমে তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। গবেষণা এগল আরও এক ধাপ, এককোষী শৈবালের প্রোটিন এবার সক্রিয় উভচর ব্যাঙের ডিমে। এসব দেখে আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক চিকিৎসক কার্ল ডিসেরথ ফস করে লিখে দিলেন এই গবেষণা অভিযান বেশ ঝুঁকির।
অবাক কাণ্ড, এই কার্ল ডিসেরথ এ-বছর নোবেল পাচ্ছেন ওই একই গবেষণায়! বেশ রাত করে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস রয়েছে কার্ল ডিসেরথের। একটি অপ্রকাশিত গবেষণাপত্র কম্পিউটারে খোলা সেদিকে অন্যমনস্ক, ফোনটা বাজে তখনই। পাশের ঘরে বাচ্চারা ঘুমিয়েছে, ফোন তুলে শুনলেন, নোবেল পেয়েছেন।
তারপর একের পর এক ফোন, শুভেচ্ছার। আর ঘুম হল না, পরের দিন সকালে বাচ্চাদের টিফিনটা বানিয়ে দিলেন। মেয়ে সকালে শুনল, বাবা নোবেল পেয়েছে, একগাল হেসে ছোট্ট একলাফে সটান বাবার কোলে। ‘পুরুষ’ হিসাবে পরিবারের তার ভূমিকা বাবার, গবেষণাগারে বিজ্ঞানীর, চেম্বারে চিকিৎসকের।
সময়ের নিখুঁত অঙ্কে সবক’টি করেন গুছিয়ে। সাক্ষাৎকারে বললেন, এই পুরস্কারে অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছেন। জিজ্ঞেস করা হল– ‘হোয়াট নেক্সট’, বললেন, ‘ল্যাবে ফিরতে চাই’। উচ্ছ্বসিত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট বলছেন, ডিসেরথের গবেষণা স্নায়ুর উদ্দীপনা ও চরিত্র বুঝতে সহায়ক হবে।
হেগেম্যান ও নাগেলের গবেষণা পরের ধাপে উতরোয় ডিসেরথের হাতযশে, ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন তিনিই। চ্যানেলরোডোপসিনের প্রোটিন ঢুকিয়ে দেন ইঁদুরের স্নায়ুকোষে, নীল আলো জ্বেলে প্রোটিনগুলিকে চালু করেন। ইঁদুরের স্নায়ুতে অতর্কিতে দৌড়ল অচেনা উদ্দীপনার বিদ্যুৎ।
বেচারি ইঁদুরগুলির স্নায়ুর দখল নিল তিনজন বিজ্ঞানী। সাহস বাড়ল আরও। আর-একটু ঝুঁকি নিয়ে প্রোটিনগুলিকে ইঁদুরের মাথায় চালু করার ব্যবস্থা হল। এবার আলোমাধ্যমে ইঁদুরের স্মৃতিতে হানা। যে-স্নায়ু ইঁদুরের ভয় বয়ে নিয়ে আসে, আলো মাধ্যমে তা চাগিয়ে তোলা হল।
তিনজন বিজ্ঞানীর গবেষণার আলোয়, ভয় নেই অথচ কেমন ভয়-ভয় পাচ্ছে ইঁদুরগুলি। এ যেন রূপকথা! জীবপ্রযুক্তি ও স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন ধারা ‘অপ্টোজেনেটিক্স’, রেটিনার আলোক সুবেদী কোষগুলি নষ্ট হলে এই পদ্ধতিতে ফিরতে পারে মানুষের দৃষ্টি।
তা দিয়ে কী করে চ্যানেলরোডোপসিন প্রোটিন পৌঁছবে মানুষের চোখে? কেন, নিরীহ কোনও ভাইরাসের পেটে প্রোটিন ভরে, ভাইরাসকে হুকুম করলেই, বাধ্য ভাইরাস দৌড়বে রেটিনায়। নোবেল ঘোষণায় দারুণ খুশি প্রফেসর আর্নস্ট ফ্রেডরিক রোসকা, ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের উদ্ভাবক ও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী।
বলছেন, অপ্টোজেনেটিক্স মাধ্যমে অন্ধজনে ফিরবে আলো। নোবেল কমিটির সদস্য অ্যানা ওয়েডেলও আশাবাদী। উনি বলছেন, এবার প্রতিটি স্নায়ুকে এক-এক করে উদ্দীপিত করে বুঝে নিতে হবে মস্তিষ্কে কে গোপনে কী করে বেড়ায়, আঁকতে হবে সুস্থ মস্তিষ্কের সার্কিট।
তাহলেই বোঝা যাবে ডিমেনশিয়া, এপিলেপ্সিতে স্নায়ুরা মস্তিষ্কে কীভাবে গুবলেট পাকায়! যদি, চ্যানেলরোডোপসিনের প্রোটিন ঢুকিয়ে ফেলা যেত আর-এক বিজ্ঞানির মস্তিষ্কে, হয়তো জানা যেত কীভাবে তৈরি হয়েছিল এমন মেজাজ। যিনি কিনা নোবেল পাওয়ার পর বলেছিলেন, ‘নোবেল বিশেষ কিছু অনুভূতি নিয়ে আসে না আমার কাছে’।
তাজ্জব! থামেননি এখানে, আরও বলেছিলেন, ‘সম্মানিত’ হতে ভাল লাগে না তঁার। কোথাকার সুইডিশ কমিটি ঘোষণা করবে গবেষণাটি নোবেলযোগ্য, তাতে কিছু আসে-যায় কি সত্যি? গবেষণা পথের রোমাঞ্চই ছিল তাঁর আনন্দ, মানুষের প্রাপ্তিই তাঁর সম্মান।
তিনি, রিচার্ড ফাইনম্যান। (মতামত নিজস্ব) লেখক অধ্যাপক।
রাজ্য ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে প্রশাসনিক ও স্থানীয় স্তরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। ঘটনার সত্যতা ও নিরপেক্ষ তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ওটু নিউজ বাংলার মূল লক্ষ্য।
প্রতি মুহূর্তের তাজা বাংলা খবর এবং ব্রেকিং খবরের আপডেটের জন্য চোখ রাখুন ওটু নিউজ বাংলায়।